ডিগ্রী ২য় বর্ষ ২০২১ রাষ্ট্রবিজ্ঞান ৪র্থ পত্র স্পেশাল শর্ট সাজেশন রেডি আছে নিতে চাইলে ম্যাসেজ করুন।
Welcome To TopSuggestion

তরাইনের ২য় যুদ্ধের গুরুত্ব ব্যাখ্যা কর

তরাইনের ২য় যুদ্ধের গুরুত্ব ব্যাখ্যা কর

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের বীজ লুকিয়ে ছিলো তরাইনের প্রথম যুদ্ধেই।
তরাইনের প্রথম যুদ্ধের পরের বছর, অর্থাৎ, ১১৯২ সালে দ্বিতীয়বারের মতো পৃথ্বীরাজ চৌহানের মোকাবেলা করতে এগিয়ে আসেন মুহাম্মদ ঘুরি। এ সময় মুহাম্মদ ঘুরির সাথে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজারের বিশাল এক সেনাবাহিনী ছিলো।
মুহাম্মদ ঘুরির অগ্রযাত্রার খবর পেয়ে পৃথ্বীরাজ চৌহানও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
 পৃথ্বীরাজের সহায়তায় প্রায় ১৫০ জন রাজপুত রাজা এগিয়ে আসেন। আশেপাশের রাজ্যের সাহায্য পেয়ে পৃথ্বীরাজ বিশাল এক সেনাবাহিনী গঠন করতে সক্ষম হন।


 ঐতিহাসিক ফারিস্তার বর্ণনায় জানা যায়, পৃথ্বীরাজের বাহিনীতে হাতিই ছিলো ৩,০০০ এর বেশি। আর অশ্বারোহীসহ সেনাবাহিনীর আকার দাঁড়ায় ৩ লাখে!
যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে উভয় পক্ষই প্রথমে কূটনৈতিক আলোচনার চেষ্টা করে। রাজপুতরা আসলে আরো কিছুটা সময় আদায় করতে চাইছিলো। রাজপুত উদয়রাজ তখনো যুদ্ধক্ষেত্রে এসে পৌঁছাতে পারেন নি। অন্যদিকে মুহাম্মদ ঘুরি নিজেকে কিছুটা দুর্বল হিসেবে প্রকাশ করতে চাইলেন, যাতে রাজপুতরা আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে। মুহাম্মদ ঘুরি এক্ষেত্রে বেশ সফল হয়েছিলেন, কারণ রাজপুত বাহিনীর ভেতরে বেশ ঢিলেঢালা ভাব এসে পরেছিলো।
মুহাম্মদ ঘুরি এই মুহূর্তটির অপেক্ষাতেই ছিলেন।
 যুদ্ধের শুরুতে তিনি চারপাশ থেকে রাজপুত সেনাবাহিনীকে ঘিরে তীর বৃষ্টি চালালেন। তবে রাজপুত সেনাবাহিনীর আকার ছিলো আক্ষরিক অর্থেই বিশাল। আর আকারের এই বিশালতার কারণে খুব সহজেই রাজপুত সেনারা নিজেদের সামলে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
 দ্রুতই রাজপুত সেনাবাহিনী মুহাম্মদ ঘুরির সেনাবাহিনীকে তীব্র বাঁধা প্রদান করেন।
তরাইনের প্রথম যুদ্ধে মুহাম্মদ ঘুরি যে ভুলটি করেছিলেন, তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে তিনি আর তার পুনরাবৃত্তি করলেন না। তিনি তার সেনাবাহিনীর তুর্কী ইউনিটটিকে তাঁদের নিজস্ব রীতিতে যুদ্ধ করতে দেন। তুর্কী যোদ্ধারাও নিজেদের চিরাচরিত পদ্ধতিতে লড়াই করার সুযোগ পেয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেন।
রাজপুত সেনাবাহিনীর বাঁধার মুখে তুর্কী অশ্বারোহীরা হঠাতই পিছু হটতে থাকেন। এতে রাজপুত সেনারা প্রবল আত্মবিশ্বাসী হয়ে তুর্কী অশ্বারোহীদের ধাওয়া করতে গেলে হঠাতই তুর্কীরা ঘুরে রাজপুতদের উপর বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষেপ করতে থাকে। রাজপুত সেনাবাহিনী এই কৌশলের সাথে পরিচিত ছিলো না। তারা হতভম্ব হয়ে পড়ে। প্রায় ৩ ঘন্টার মতো রাজপুত বাহিনীর উপর তীর নিক্ষেপ হতে থাকে। অসহায়ের মত দেখা ছাড়া তাঁদের আর করার মতো তেমন কিছু ছিলো না। একপর্যায়ে রাজপুত সেনারা তাঁদের মনোবল হারিয়ে ফেলে। তাছাড়া তাঁদের শারিরীক সামর্থ্যও সহ্যের শেষ সীমায় চলে যায়।
তবে শুধু তুর্কী কৌশলই শেষ না, মুহাম্মদ ঘুরির আরো চমক দেখানো বাকী ছিলো। তিনি এবার তাঁর ১২ হাজার রিজার্ভ সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করেন। একে তো তীব্র আতঙ্কে রাজপুত সেনারা যুদ্ধ করার ইচ্ছাই হারিয়ে ফেলেছে, তার উপর পরিশ্রান্ত রাজপুত সেনাদের উপরে আক্রমণ চালায় সম্পূর্ণ সতেজ রিজার্ভ সৈন্যরা। রাজপুত সেনাবাহিনী এবার আর যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারলো না। রাজপুত বাহিনীর শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙ্গে যায়। ইতোমধ্যেই পৃথ্বীরাজ চৌহানের সবচেয়ে অভিজ্ঞ সেনাপতি খান্ডে রাও নিহত হন, যা রাজপুত বাহিনীর চূড়ান্ত পতন তরান্বিত করে।
 রাজপুত সেনারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নের চেয়ে মৃত্যু অধিক পছন্দ করত। তাই পলায়ন না করে অসহায়ভাবে নিজেদের মাথা তলোয়ারের সামনে পেতে দেয়া ছাড়া তাদের আর কিছুই করার ছিলনা। যুদ্ধে অধিকাংশ রাজপুত সেনা নিহত হয়।
 যুদ্ধেরই এই পর্যায়ে রাজপুত বীর রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান বন্দি হন এবং পরবর্তীতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
#ফলাফলঃ
 তরাইনের এই দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহানের পরাজয়ের সাথে সাথে হিন্দুস্তান থেকে শেষ স্বাধীন হিন্দু রাজ্যটিরও পতন ঘটে। আর ঠিক এই কারণেই, হিন্দুস্তানের ইতিহাসে হিন্দুদের কাছে বীর পৃথ্বীরাজ চৌহানের গুরুত্ব অনেক বেশি।
এই যুদ্ধের পরেই প্রথম ভারতবর্ষে ইসলামি শাসনের সূচনা হয়।


#মুহাম্মদ ঘুরির মৃত্যুঃ-
শিহাবুদ্দীন মুহাম্মদ ঘুরির মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, তা নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি আছে।
ভারতীয় লোক গাঁথা অনুযায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পৃথ্বীরাজ মৃত্যুবরণ করেননি। বরং তিনি বন্দী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে বন্দীদশায় সুযোগ পেয়ে মুহাম্মদ ঘুরিকে তিনি হত্যা করেন। মুহাম্মদ ঘুরির মৃত্যুসংক্রান্ত এই মতবাদটি একটু বেশিই কল্পনাপ্রবণ ও অবাস্তব কারণ ঘুরির মৃত্যুর ১৪ বছর আগেই পৃথ্বীরাজ নিহত হন।
ফারিস্তার পূর্ববর্তী ঐতিহাসিকদের মত হচ্ছে, ১২০৬ সালের ১৫ মার্চ মাগরিবের নামাজ আদায়রত অবস্থায় খোকার বা  ইসমাইলিরাহিন্দুস্তানে মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠাকারী শিহাবুদ্দীন মুহাম্মদ ঘুরিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে এবং এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত।

 

আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিমে গজনী ও হেরাতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ছিল ঘুর রাজ্য। গজনীর এবং ঘুর রাজ্য ছিল পরস্পর বিবাদমান। এই বিবাদের সূত্র ধরেই 1173 খ্রিস্টাব্দে ঘুর শাসক গিয়াস উদ্দিন মোহাম্মদ গজনী রাজ্য দখল করেন এবং তিনি তাঁর ভ্রাতা মইজুদ্দিন মহম্মদ বিন সাম কে গজনীর শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। ইনি ভারতের ইতিহাসে মহাম্মদ ঘরি নামে পরিচিত। বড় ভাই এর অধীনে নিযুক্ত সেনাপতি হিসাবেই মোহাম্মদ ঘরি ভারতে অভিযান করেছিলেন। মোহাম্মদ ঘরি যখন ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিকে বিভিন্ন রাজ্যে অভিযান করছিলেন সেই সময় উত্তর ভারতে চৌহান রাজবংশ তৃতীয় পৃথ্বীরাজ এর নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। মোহাম্মদ ঘরি ও পৃথ্বীরাজ চৌহান এর মধ্যে তরাইনের প্রান্তরে দুটি যুদ্ধ হয়েছিল (1191 ও 1192 সালে), যা যথাক্রমে তরাইনের প্রথম ও দ্বিতীয় যুদ্ধ নামে পরিচিত।



1189 খ্রিস্টাব্দে মোহাম্মদ ঘরি ভাতিন্ডা আক্রমণ করে অধিকার করেন এবং জিয়াউদ্দিন নামে একজন অনুচরকে দুর্গের অধিপতি নিযুক্ত করেন। এরপর তরাইনের প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে পৃথ্বীরাজের এক বিশাল বাহিনী মোহাম্মদ ঘরিকে পরাজিত করে। এই যুদ্ধে বহু রাজপুত রাজা পৃথ্বীরাজ এর পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন। কেবল কনৌজের রাঠোর রাজা জয়চাঁদ  নিরপেক্ষ ছিলেন। ঘড়ি কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে রণক্ষেত্র ত্যাগ করেন। এর ঠিক এক বছর পরে তিনি পুনরায় পৃথ্বীরাজ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং এই যুদ্ধে তিনি জয় লাভ করেন। পলাতক পৃথ্বীরাজকে পরবর্তীকালে বন্দি করা হয়। মিনহাজ এর মতে পৃথ্বীরাজকে হত্যা করা হয়েছিল। ঐতিহাসিক হাসান নিজামী দেখিয়েছেন যে, পৃথ্বীরাজকে আজমির ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কারণ এই সময়কার কয়েকটি মুদ্রায় তারিখ সহ এক পৃষ্ঠে "পৃথ্বীরাজ দেব" এবং অপর পৃষ্ঠে 'শ্রী মহাম্মদ সাম" কথাগুলি লেখা আছে। অবশ্য পরবর্তীকালে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে পৃথ্বীরাজকে হত্যা করে তার পুত্রকে সিংহাসন দেওয়া হয়েছিল। দিল্লি তোমার শাসকদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে ঘরিদের রাজনৈতিক নীতির পরিবর্তন ঘটে এবং আজমির ও দিল্লি দখল করে সেখানে তুর্কি শাসক নিয়োগ করা হয়।

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক সীমা মীমাংসক যুদ্ধ। পৃথ্বীরাজের পরাজয় এর ফলে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। বিদেশিদের বাধা দেওয়ার মত আর কোন শক্তি অবশিষ্ট রইল না। ভারতীয় রাজনীতিতে রাজপুত জাতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ হয়ে গেল। একইসাথে এই পরাজয় পৃথ্বীরাজের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা নজির স্থাপন করল। কারণ প্রথম যুদ্ধে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও ঘরির অনুগামীদের উদ্দেশ্য তিনি বুঝতে পারেননি, তাই পাঞ্জাব থেকে তাদের বিতাড়নের ব্যবস্থাও করেননি। অন্যদিকে তরাইনের যুদ্ধের মাধ্যমে ভারতে তুর্কি সাম্রাজ্য স্থাপনের পথ উন্মুক্ত হয়। মহম্মদ ঘরি তার বিজিত অঞ্চলের দায়িত্ব কুতুবউদ্দিন আইবক নামে এক বিশ্বস্ত অনুচর এর উপর অর্পণ করে গজনী ফিরে যান। ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো একজন দাসের শাসন প্রতিষ্ঠা হল। কুতুবউদ্দিন আইবক ভারতে সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করলেন যা পরবর্তী 300 বছর স্থায়ী হল।

 

 

Share This

0 Response to "তরাইনের ২য় যুদ্ধের গুরুত্ব ব্যাখ্যা কর"

Post a Comment

Popular posts