করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সম্ভাবনা নেই।। শিক্ষামন্ত্রী।
Welcome To TopSuggestion

বাঙালি একটি সংকর জাতি কেন

বাঙালি একটি সংকর জাতি কেন

অল্পকথায় বাঙালি জাতির নৃ - গােষ্ঠীগত পরিচয় প্রদান করা অসম্ভব । কেননা এ সম্পর্কে যেমন কোনাে সঠিক ও নির্ভরযােগ্য গবেষণা ও সম্পাদিত হয়নি , তেমনি এ সম্বন্ধে ইতিহাসে যে তথ্য পাওয়া যায় তাও ততটা নির্ভুল নয় । তবে একথা বলা যায় যে , বর্তমান বাঙালি নরগােষ্ঠী বহুকাল ধরে নানা জাতির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে । বিভিন্ন জাতিবর্ণের রক্ত প্রবাহ বাঙালি জাতির ধমনীতে সঞ্চারিত হয়েছে । এজন্য অনেকে বাঙালি জাতিকে সংকর জাতি হিসেবেও অভিহিত করেছেন । বাঙালি জনগােষ্ঠীর মধ্যে যে সকল জাতির রক্তপ্রবাহ বিদ্যমান তা আলােকপাত করার মাধ্যমে বাঙালি জাতি আসলেই একটি সংকর বা মিশ্র জাতি কি - না তার উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে ।

 ১. আদি অস্ট্রেলীয় প্রভাব :   

বাংলাদেশের অধিবাসীদের মধ্যে আদি - অস্ট্রেলীয় প্রভাব বিদ্যমান । আদি - অস্ট্রেলীয়রা এ অঞ্চলের অন্যতম আদিবাসী । শ্রীলংকার ভেডিডড জাতির সাথে এদের দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য বিদ্যমান । যেমন- লম্বাকৃতির মাথা , চওড়া নাক , গায়ের রং কালাে , গড়নে বেঁটে বা মধ্যমাকৃতির । বাংলাদেশের সাওতাল , ওঁরাও উপজাতি এবং কিছু সমতলবাসীর মধ্যে এ ধরনের দৈহিক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় । 

২. মঙ্গোল - দ্রাবিড় গােষ্ঠীর প্রভাব : 

 ভারতীয় উপমহাদেশের আদিবাসীরা দ্রাবিড় ভাষায় কথা বলত । কিন্তু দ্রাবিড় আর ভেডিডড অভিন্ন নাকি ভিন্ন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে । আবার এ আদিবাসী ভেডিডড দ্রাবিড়দের ওপর মঙ্গোলীয় প্রভাব রয়েছে । মঙ্গোলীয়রা পীতবর্ণ , গােল মাথা , ক্ষুদ্রাকৃতির চোখ , চোয়ালের উঁচু হাড় বিশিষ্ট — এসব বৈশিষ্ট্য এদেশের জনগােষ্ঠীর মধ্যে কমবেশি লক্ষ করা গেছে । রিজলে অনুমান করেন যে , বাঙালি নৃগােষ্ঠীতে মঙ্গোলীয় প্রভাব রয়েছে । তিনি আবার এদের গায়ের রং , নাকের গড়ন , চোখের গড়ন ইত্যাদি দেখে বলেছেন যে , এদের মধ্যে দ্রাবিড় প্রভাবও বিদ্যমান । সুতরাং রিজলের বক্তব্য অনুযায়ী বলা চলে , বাঙালিরা মঙ্গোল - দ্রাবিড় প্রভাবিত এক সংকর জনগােষ্ঠী ।

 

৩. আর্য ভাষাভাষীর প্রভাব : 

 আর্যরা দ্রাবিড় ভেডিডদের পদানত করে । আর্যরাই ভারতবর্ষে বর্ণাশ্রম প্রথার সৃষ্টি করে । আর্যদের বৈশিষ্ট্য হলাে : লম্বা নাক ও বাদামি বা কটা চোখ । ব্রাহ্মণ , বৈদ্য , কায়স্থদের মধ্যে এদের প্রভাব কমবেশি দেখা যায় । বাংলাদেশে ব্রাহ্মণরা দাবি করে যে , তারাই খাটি আর্যদের বংশধর । 

৪ , অস্ট্রেলীয় ও দ্রাবিড় প্রভাব : 

নীহাররঞ্জন রায় প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আদি অস্ট্রেলীয় ও দ্রাবিড় নৃগােষ্ঠীর ধর্মীয় আচার - বিশ্বাস এদেশীয় হিন্দু সমাজে প্রবেশ করেছে । সুতরাং এদেশীয় হিন্দুদের নৃগােষ্ঠী গঠনে এসব আদি অস্ট্রেলীয় ও দ্রাবিড় প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ । 

৫. আলপাইন নরগােষ্ঠীর প্রভাব :

 নৃবিজ্ঞানী হুটন উপমহাদেশের জনসমষ্টির নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে , আলপাইন মানবগােষ্ঠীর সাথে বাঙালি জনগােষ্ঠীর অনেক দৈহিক মিল রয়েছে । 

৬. নিগ্রোবটু ও আলপাইনিয়দের প্রভাব :

 প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী বিরাজ শংকর গুহ মনে করেন যে , বাঙালিদের ওপর নিগ্রোবটু ও আলপাইনিয়দের প্রভাব দৃশ্যমান ।

৭. মুণ্ডাভাষীদের প্রভাব :

 প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে আগত মুণ্ডাভাষী এবং মুণ্ডা - পূর্ব আদিবাসীদের দান এদেশে বিশেষ করে এদেশের পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য । দক্ষিণ এশিয়ায় মঙ্গোল প্রভাব বাংলাদেশে বেশি হলেও , আদিবাসী ও মুণ্ডাভাষীদের তুলনায় তা কম । উত্তর থেকে মঙ্গোলরা শিকার বা কৃষি যে কারণেই এদেশে আসুক না কেন , সমতলের রােগব্যাধির প্রতি ছিল তাদের দারুণ ভয় । এজন্য সমতলে তারা আসেনি । বােড়ােভাষী গারাে ও ত্রিপুরী মঙ্গোলরা অন্যান্য আদিবাসীদের ভাষা আত্মসাৎ করে ফেললেও খাসি ও পাড়রা তাদের ভাষা রক্ষা করতে সক্ষম হয় । চাকমাদেরকে মঙ্গোল মনে করা হয় । তারা বাংলা ভাষা শিখেছে । মধ্যযুগে বার্মা - আরাকান থেকে মারমা , বােম , খ্যাং , কুমি , পা , চাক ; মনিপুর থেকে মনিপুরী , মিজোরাম থেকে লুসাই ইত্যাদি বিভিন্ন উপজাতি এদেশে আসে । মালয় , তেলেগু বা তামিলরাও এসেছে এদেশে , সমুদ্র পাড়ি দিয়ে । তাদের সংখ্যাও কম নয় । 

৮. বহিরাগত মুসলমানদের প্রভাব :  

বাঙালি জাতির ওপর বহিরাগত মুসলমানদের প্রভাবও খুবই গুরুত্বপূর্ণ । অষ্টম ও নবম শতকে এদেশে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে পীর , আউলিয়া ও তাদের অনুগামী শিষ্যরা এসেছিলেন । তাই ধারণা করা হয় , ঐসব দেশ বিশেষ করে তুর্কি , আফগান , মুঘল , আরবি , আবিসিনিয়া , ইরান ইত্যাদি মুসলিম দেশের জনগােষ্ঠীর প্রভাব লক্ষণীয়।

নীহার রঞ্জন রায় বলেছেন , “ গঙ্গা - করতােয়া - লৌহিত্যবিধৌত , সাগর - পর্বতধৃত , রাঢ় - পু - বঙ্গ - সমতট — এই চতুর্জনপদ সমৃদ্ধ বাংলাদেশে প্রাচীনতম কাল হইতে আরম্ভ করিয়া তুর্কি অভ্যুদয় পর্যন্ত কত বিভিন্ন জন , কত বিচিত্র রক্ত ও সংস্কৃতির ধারা বহন করিয়া আনিয়াছে এবং একে একে ধীরে কোথায় কে কীভাবে বিলীন হইয়া গিয়াছে ইতিহাস তাহার সঠিক হিসাব রাখে নাই । সজাগ চিত্তের ও ক্রিয়াশীল মননের রচিত কোনও ইতিহাসে তাহার হিসাব নাই একথা সত্য , কিন্তু মানুষ তাহার রক্ত ও দেহ গঠনে , ভাষায় ও সভ্যতার বাস্তব উপাদানে এবং মানসিক সংস্কৃতিতে তাহা গােপন করিতে পারে নাই । সকলের উপর এই বিচিত্র রক্ত ও সংস্কৃতির ধারা তাহার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রাখিয়া গিয়াছে বাঙালির প্রাচীন সমাজজীবনের মধ্যে ” ।৮১ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে তাই বলা যায় “ কেহ নাহি জানে , কার আহ্বানে কত মানুষের ধারা , দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে সমুদ্রে হল হারা । "

Share This

0 Response to "বাঙালি একটি সংকর জাতি কেন"

Post a Comment

Popular posts