করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সম্ভাবনা নেই।। শিক্ষামন্ত্রী।
Welcome To TopSuggestion

এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার কী বিস্তারিত আলোচনা কর

 ভূমিকা:

কেন্দ্রও অঙ্গরাজ্য বা অংশের মধ্যে ক্ষমতা বন্টনের ভিত্তিতে আধুনিক সরকারকে এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় এ দু’ভাগে বিভক্ত

করা হয়েছে। রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা যখন একটি মাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্তথাকে তখন তাকে এককেন্দ্রিক সরকার



বলে। এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় শাসনতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকে। এই ব্যবস্থায়

প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক সরকারের অস্তিত্বথাকতে পারে, তবে তা কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়। শাসনতন্ত্রের

বলে তারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয় না। তারা কোন মৌলিক ক্ষমতার অধিকারী নয়। এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক

সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্ট হিসাবে কাজ করে। ফ্রান্স, জাপান, যুক্তরাজ্য, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশ এককেন্দ্রিক সরকারের

উদাহরণ।

যুক্তরাষ্ট্রগঠিত হয় একাধিক রাজ্য বা রাষ্ট্রের সমন্বয়ে। রাজনৈতিক জীবনে পূর্ণতা প্রাপ্তির জন্য তারা স্থায়ীভাবে সংঘবদ্ধ হয়।

কতকগুলো ছোট ছোট অঞ্চল একত্রিত হয়ে শাসনতন্ত্রেউল্লেখিত ক্ষমতা বন্টনের ভিত্তিতে যখন একটি বৃহৎ রাষ্ট গঠন করে

তখন একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার গঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় শাসনতন্ত্রনিরপেক্ষ দলিল হিসেবে কেন্দ্রও প্রদেশের মধ্যে

ক্ষমতা বন্টন করে। ক্ষমতা বন্টন কেন্দ্রীয় সরকারের উপর নির্ভর করে না। যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারে খুব সংগত কারণেই সংবিধানের

প্রাধান্য রক্ষা করা হয়। সুপ্রীম কোর্ট সংবিধানের প্রাধান্য রক্ষা করে। ভারত, কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের

দৃষ্টান্ত।


এককেন্দ্রিক সরকার:

এককেন্দ্রিক সরকার এক ধরনের একক, অখন্ড ও সুসংবদ্ধ সরকার ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয়

সরকারের হাতে ন্যস্তথাকে। এ ধরনের শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রই থাকে সকল ক্ষমতার উৎস। এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায়

আঞ্চলিক বা স্থানীয় সরকারের অস্তিত্বথাকতে পারে, এ সরকারগুলো কিছু কিছু ক্ষমতা উপভোগ করতেও পারে। তবে তাদের

ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে এ সরকারগুলো তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করে। কেন্দ্রীয়

সরকার ইচ্ছা করলে এ ক্ষমতা বাড়াতে পারে, কমাতেও পারে। এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় স্থানীয় বা আঞ্চলিক সরকারগুলোর

সাংবিধানিক কোন ক্ষমতা নেই। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, বাংলাদেশ এ ধরনের সরকারের উদাহরণ।

এককেন্দ্রিক সরকারের বৈশিষ্ট্য:

 ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণ এককেন্দ্রিক সরকারের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা কেন্দ্রের উপর ন্যস্ত

থাকে।

 কেন্দ্রের মাধ্যমে ক্ষমতার বন্টন এককেন্দ্রিক সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ ব্যবস্থায় আঞ্চলিক বা স্থানীয় সরকার থাকতে

পারে। কিন্তুতারা ক্ষমতা লাভ করে কেন্দ্রের কাছ থেকে। কেন্দ্রতার ইচ্ছামত এ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে বা কমাতে পারে।

 আঞ্চলিক বা স্থানীয় সরকারের নিজস্বকোন ক্ষমতা থাকে না। সাংবিধানিক ভাবে এরা কোন ক্ষমতা উপভোগ করে না।

সরকারের সব বিভাগ ও অঙ্গ একটি অবিভাজ্য প্রশাসনিক যন্ত্রের অধীন।

 এককেন্দ্রিক সরকারের আঞ্চলিক বা স্থানীয় সরকারগুলো কোন স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে না। এরা কেন্দ্রীয় বা একক

সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে ক্ষমতা ব্যবহার করে।

 এককেন্দ্রিক সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর ঐক্য। যেহেতু এ ধরনের সরকারে ক্ষমতার বিভাজন নেই, তাই জটিলতাও

কম। শাসন ব্যবস্থায় সাংগঠনিক সারল্য বিদ্যমান এবং নীতি প্রণয়নের সমস্যা কম।


এককেন্দ্রিক সরকারের গুণ:

এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থায় অনেকগুলো গুণ রয়েছে। নিচে তা আলোচনা করা হল:

 এককেন্দ্রিক সরকারের অন্যতম গুণ হল এর সাংগঠনিক সরলতা। এ সরকার খুব সহজেই সংগঠিত হতে পারে। প্রয়োজন

শুধুএককেন্দ্রিক সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের ফলেই সরকার গঠনের জটিল সমস্যাটি সহজ হয়ে ওঠে। কারণ

এ ধরনের ব্যবস্থায় ক্ষমতা বিভক্তিকরণের কোন প্রয়োজন হয় না, তাই একটি মাত্র সরকারই প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

 এককেন্দ্রিক সরকার সহজে কার্যকর হতে পারে। কারণ এ ধরনের ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা একটি কেন্দ্রে ন্যস্তথাকে। তাই

যে কোন সমস্যার সমাধান দ্রুত করা যায়। এখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কম থাকে বলে কোন সমস্যার সমাধানে পূর্ণ ক্ষমতা

প্রয়োগ করা যায়। এছাড়া একই কেন্দ্রথেকে আইন প্রয়োগ হয় বলে সর্বত্র একই আইন বিরাজমান।

 এককেন্দ্রিক সরকার কম ব্যয়বহুল। কারণ এ ধরণের ব্যবস্থায় নীতি প্রণয়ন, নীতি প্রয়োগ ও নীতি পর্যবেক্ষণে কোন

সমস্যা হয় না। সরকার একটি মাত্র কেন্দ্রথেকে সবধরনের কাজ পরিচালনা করতে পারে।

 একটি মাত্র কেন্দ্রথেকে শাসন ক্ষমতা প্রয়োগ ও পরিচালনা হয় বলে যে কোন সমস্যা মোকাবেলায় এ ধরনের সরকার

নমনীয়ভাবে সমাধানে আসতে পারে। প্রয়োজনে অতি বিপদেও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যা নিরসন করতে পারে।

 এককেন্দ্রিক সরকার খুব দ্রুত যে কোন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিপদ ও সংকটের মোকাবিলা করতে পারে। কারণ এখানে

একটি মাত্র কেন্দ্রের হাতেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে। প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক সরকার থাকলেও ক্ষমতা তাদের

হাতে থাকে না বরং তারা কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।

 এককেন্দ্রিক সরকার বিশেষত ছোট রাষ্ট্রের জন্য বেশী উপযোগী। এছাড়াও যে সব রাষ্ট্রেভৌগোলিক, জাতীয়, সাংস্কৃতিক

ঐক্য আছে সে সব রাষ্ট্রের এ ধরনের সরকার ব্যবস্থা উপযোগী।

 শাসনতান্ত্রিক যে কোন সংস্কার সাধনের জন্য এককেন্দ্রিক সরকার অত্যন্তউপযোগী। কারণ দ্রুত কোন সংস্কারের সিদ্ধান্ত

গ্রহণ ও প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ও জনগণের উন্নয়ন এ ধরনের সরকার ব্যবস্থায় সহজসাধ্য।

 এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থায় একটি কেন্দ্রের অধীনে শাসন কার্য পরিচালিত হয় বলে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বজায় থাকে।

দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সম্ভাবনা কম থাকে।

 এককেন্দ্রিক সরকার সামাজিক উন্নয়নের ধারক ও বাহক । এ ব্যবস্থায় সরকার তার ক্ষমতা, দক্ষতা, মেধা, শক্তি ও

সামর্থ্য একত্রিত করে যে কোন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে আত্মনিয়োগ করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের পাশাপাশি জনগণের

জীবনের উন্নয়ন সাধন করতে পারে।

 এ ব্যবস্থায় সময়ের অপচয় কম হয়। কারণ কেন্দ্রীয় সরকারকে কোন প্রাদেশিক সরকার, কোন বিভাগ বা স্তর-কারও সাথে

আলাপ আলোচনা করতে হয় না। তাই সময়ের অপচয় যেমন রোধ করা যায়, কাজও দ্রুত সমাধা করা যায়।

এককেন্দ্রিক সরকারের দোষ

অনেকগুলো গুণের পাশাপাশি এককেন্দ্রিক সরকারের কতকগুলো দোষও আছে, যে দোষগুলোর কারণে এ ধরনের সরকার

ব্যবস্থার প্রয়োগযোগ্যতা কিছুটা হলেও সীমিত হয়েছে। নীচে এককেন্দ্রিক সরকারের দোষগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা

হল।

 এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা স্বৈরতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রস্তুত করে। কারণ এখানে ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে বলে শাসক

সহজে স্বৈরশাসকে পরিণত হতে পারেন।

 এ ধরনের সরকার ব্যবস্থায় আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ক্ষমতা সাংবিধানিক ভাবে অর্পিত হয় না ফলে

আঞ্চলিক বা স্থানীয় সমস্যার অনেক সময়ই সমাধান করা সম্ভব হয় না। স্থানীয় সমস্যা উপেক্ষিত থাকে।

 স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার বিভাজন নেই বলে স্থানীয় ব্যক্তিরা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। ফলে স্থানীয়

নেতৃত্ব বিকশিত হয় না। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পরবর্তীতে রাজনীতি সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েন, গণতন্ত্রের

সাফল্যের জন্য এ মনোভাব কাম্য নয়।

 এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা খুব বেশী দেখা যায়। যেহেতু শাসনক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে, তাই

এ ধরনের ব্যবস্থায় আমলাদের ক্ষমতা ও প্রভাব খুব বৃদ্ধি পেতে পারে। আমলারাও শাসন ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করে জটিলতা

বৃদ্ধি করেন ফলে কাজ সম্পাদনের গতি ধীর হয়ে পড়ে।

 এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় শাসন পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকে কেন্দ্রের হাতে। ফলে কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা ও

কাজের চাপ বৃদ্ধি পায়। তাই কোন কোন সময় কেন্দ্রসুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পাদনে সক্ষম হয় না। বিশেষতঃ আন্তর্জাতিক

সমস্যা মোকাবেলায় ব্যস্তথেকে জাতীয় সমস্যার সমাধান উপেক্ষিত হতে পারে।

 এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থা বড় বড় রাষ্ট্রের জন্য উপযোগী নয়। ছোট ভুখন্ড, ক্ষুদ্রজনগোষ্ঠী এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থাকে

সাফল্য দিতে পারে। বৃহৎ রাষ্ট্রবা বৃহৎ জনগোষ্ঠীতে এর প্রয়োগ হলে শাসনকার্য দূরূহ হয়ে পড়ে।



সারকথা

দ্রুত উন্নয়ন ও কর্মপন্থা বাস্তবায়নের জন্য এককেন্দ্রিক সরকার অত্যন্তউপযোগী। কারণ এক্ষেত্রে কেন্দ্রক্ষমতা লাভ করে

সংবিধানের মাধ্যমে আর স্থানীয় সরকার ক্ষমতা লাভ করে কেন্দ্রের কাছ থেকে। ফলে সিদ্ধান্তবাস্তবায়নে কেন্দ্রকে কোন বাঁধার

সম্মুখীন হতে হয় না। সরকার গঠন করাও খুবই সহজসাধ্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উইলোবী যথার্থই বলেছেন, “এককেন্দ্রিক সরকার

প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তগ্রহণ করলে সরকারের সংগঠন সমস্যা অত্যন্তসহজ হয়ে পড়ে।’’ তবে এ ব্যবস্থায় স্থানীয় সমস্যাগুলো উপেক্ষিত

হয়ে পড়ে। স্থানীয় নেতৃত্বেবিকশিত হওয়ার সুযোগ কম থাকায় গণতন্ত্রবিপদগ্রস্থহতে পারে। তা ছাড়া এককেন্দ্রীয় ব্যবস্থায়

আমলাতন্ত্রশক্তিশালী হয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের জন্য হুমকী স্বরূপ হয়ে উঠতে পারে। 








যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার:

যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার হল এমন এক ধরনের সরকার ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক
সরকারের মধ্যে বন্টন করা হয়। ডাইসি বলেছেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এমন এক রাজনৈতিক সংগঠন যেখানে জাতীয় সরকারের
সাথে প্রাদেশিক সরকারের অধিকারের সামঞ্জস্যপূর্ণ সমন্বয় সাধন সম্ভব হয়।’’ এ ব্যবস্থায় ক্ষমতা বন্টন এমন প্রক্রিয়ায় হয়, যার
ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ও আঞ্চলিক সরকার - প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় স্বতন্ত্রও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। এ
অভিমত ব্যক্ত করেছেন, কে, সি, হুইয়ার  (By the federal principle, I mean the method of dividing power so that the general and regional governments are each within a sphere co-ordinate and independent.)

যুক্তরাষ্ট্রের ইংরেজী প্রতিশব্দ Federation এসেছে ল্যাটিন শব্দ ফোয়েডাস (Foedus) থেকে। এর অর্থ ঐক্য বা মিলন। সুতরাং
শব্দগত অর্থে যুক্তরাষ্ট্রবলতে বোঝায় ঐক্য বা মিলনের ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রকে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি রাষ্ট্রবা প্রদেশের সমন্বয়ে
গঠিত হয় একটি রাষ্ট্র- যেখানে সাংবিধানিক ভাবে কেন্দ্র ও অঞ্চলের মধ্যে ক্ষমতার বন্টন হয়ে থাকে। কেউ কারও অধীন
নয় এবং প্রত্যেকের ক্ষমতার উৎস থাকে সংবিধান। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত এ ধরনের সরকার
ব্যবস্থার উদাহরণ। কতকগুলো নির্দিষ্ট ও সাধারণ স্বার্থের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগুলো একত্রিত হয়ে একটি কেন্দ্রবা ফেডারেশন গঠন
করে থাকে। সাধারণত প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রবিষয়ক ক্ষমতা ব্যতীত অন্যান্য ক্ষমতা যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কৃষি, সামাজিক
উন্নয়নমূলক ক্ষমতা ইত্যাদি অঙ্গরাজ্যের হাতে ন্যস্তথাকে।
যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের বৈশিষ্ট্য
যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের কতকগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এই সরকার ব্যবস্থাকে এককেন্দ্রিক সরকার থেকে ভিন্নতা দান করেছে।


বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্ন আলোচনা করা হল:
 দু’ধরনের শাসন ব্যবস্থা : যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় দু’ধরনের সরকার ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকে। যেমন : কেন্দ্রীয় সরকার ও
আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকার। এ ধরনের শাসনব্যবস্থায় উভয়ই ভিন্নভিন্নমর্যাদার অধিকারী এবং কেউ কারও অধীন
নয়। সংবিধান কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাবলে উভয়েই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে স্বাধীন এবং গঠিত রাষ্ট্রগুলো সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন
উপভোগ করে।
 স্বাধীন সত্তা বিদ্যমান : যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হ’ল বিভিন্নঅঙ্গরাজ্যের বা প্রদেশের সম্মিলন। এখানে সবাই
ঐক্যবদ্ধ হয়, কিন্তুএকীভূত হয় না। প্রত্যেকেরই স্বাধীন সত্তা বিদ্যমান থাকে এবং যার যার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে থাকে।
 ক্ষমতা বন্টন : যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারে ক্ষমতা বন্টিত হয় সংবিধানের মাধ্যমে, যদিও ক্ষমতা বন্টন নীতি বিভিন্নযুক্তরাষ্ট্রেভিন্ন
ভিন্নহতে পারে। সাধারণতঃ জাতীয় বিষয়গুলো থাকে কেন্দ্রের হাতে এবং আঞ্চলিক বিষয়গুলো আঞ্চলিক সরকারের
হাতে থাকে।
 স্বায়ত্তশাসন : আঞ্চলিক সরকার বা অঙ্গরাজ্যগুলো সার্বভৌম ক্ষমতা ভোগ করে না, তবে সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসন উপভোগ
করে। স্বায়ত্তশাসন যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য।
 সংবিধানের সার্বভৌমত্ব: সংবিধানের প্রাধান্য যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থাকে অন্যান্য ব্যবস্থা থেকে ভিন্নতা দান করেছে।
সংবিধান সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ দলিল এবং যুক্তরাষ্ট্র সংবিধান কর্তৃক সৃষ্ট। সংবিধানের ক্ষমতাই এখানে
চূড়ান্ত। যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থায় সংবিধান সার্বভৌম।

 লিখিত সংবিধান ঃ সুস্পষ্ট ও লিখিত সংবিধান ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৈশিষ্ট্য। সাধারণত: যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সংবিধান
লিখিত ও দুষ্পরিবর্তনীয় হয়। আঞ্চলিক সরকারের স্বার্থ যেন ক্ষুন্ননা হয়, সেজন্যই সাধারণত: এ ব্যবস্থা গৃহীত হয়ে
থাকে।
 বিচারবিভাগের প্রাধান্য ঃ যুক্তরাষ্ট্রীয় বিচারালয় এ ধরনের ব্যবস্থায় সংবিধানের রক্ষক হিসাবে কাজ করে। কেন্দ্রও অঞ্চলের
মধ্যে কোন বিরোধ দেখা দিলে মীমাংসার দায়িত্বনেয় এই বিচারালয়। এ ছাড়া সংবিধানের ব্যাখ্যাও করে থাকে যুক্তরাষ্ট্রীয়
আদালত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের প্রাধান্য দেখা যায়। সুপ্রীম কোর্ট সংবিধানের রক্ষক ও অভিভাবক
হিসাবে কাজ করে থাকে।
 দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ঃ যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থায় সাধারণত দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা দেখা যায়। নিম্নকক্ষ সমগ্র
জাতির প্রতিনিধিত্বকরে এবং উচ্চকক্ষ প্রদেশ বা আঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকরে।
 দ্বৈত নাগরিকতা ঃ দ্বৈত নাগরিকতা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। প্রত্যেক নাগরিকই এখানে দুধরনের
নাগরিকতা উপভোগ করে। (ক) স্বীয় অঙ্গরাজ্যের এবং (খ) যুক্তরাষ্ট্রের। দুধরনের নাগরিকতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের
নাগরিকককে দ্বৈত আনুগত্যও প্রকাশ করতে হয়।
 কেন্দ্রমুখী ও কেন্দ্রবিমুখী প্রবণতা ঃ যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর অঙ্গরাজ্যগুলোর কেন্দ্রমুখী এবং
কেন্দ্রবিমুখী প্রবণতা। অঙ্গরাজ্যগুলো কেন্দ্রের প্রতি অনুগত থাকে এবং একই সঙ্গে নিজেদের স্বাধীন সত্তাও বজায় রাখে।
কেন্দ্রেবিলীন হ’তে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার কেন্দ্রমুখী ও কেন্দ্রবিমুখী শক্তির মধ্যে সমন্বয় বিধান করে।

যুক্তরাষ্ট্রের গঠন প্রণালী:
দুটি পদ্ধতিতে যুক্তরাষ্ট্রগঠিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের গঠন প্রণালী নিচে আলোচিত হলঃ
প্রথমত ঃ ছোট ছোট কতকগুলো রাষ্ট্রনিজেদের স্বার্থে ও নিরাপত্তা রক্ষার কারণে একত্রিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রগঠন করতে পারে।
এর ফলে তারা স্বায়ত্তশাসন যেমন ভোগ করে তেমনি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধাও লাভ করে।
দ্বিতীয়ত ঃ কোন বৃহৎ রাষ্ট্রসমস্যার সম্মুখীন হয়ে সাংবিধানিকভাবে অঞ্চলগুলোর মধ্যে ক্ষমতা বন্টন করে যুক্তরাষ্ট্রগঠন করতে
পারবে, এতে তার অখন্ডতা যেমন বজায় থাকে, তেমনি স্বায়ত্তশাসন লাভের মাধ্যমে অঞ্চলগুলোও কেন্দ্রের সাথে সদ্ভাব বজায়
রাখতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের গুণ:
যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার কতকগুলো সুফল নীচে আলোচনা করা হলঃ

 এ ব্যবস্থায় ছোট ছোট দুর্বল রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে বৃহৎ রাষ্ট্রের সুবিধা ও সুফলগুলো
ভোগ করতে পারে।

 এ ব্যবস্থা আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্য ও জাতীয় ঐক্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটায়। জাতীয় বিষয়গুলো কেন্দ্রএবং আঞ্চলিক বিষয়গুলো
অঞ্চল পরিচালনা করে দ্রুত উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারে।
 ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলো সার্বভৌমত্ববিসর্জন দিয়ে লাভ করে স্বায়ত্তশাসন, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ক্ষমতা। স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে
নিজেদের স্বাতন্ত্র্যও রক্ষা করতে পারে। ফলে শক্তিশালী রাষ্ট্রের যে সুবিধা তাও এরা লাভ করে।

 সাংবিধানিক ভাবে ক্ষমতা বন্টন হয় বলে কেন্দ্রও আঞ্চলিক সরকার - উভয়েরই কাজ নির্দিষ্ট থাকে। ফলে কেউ কারো
কাজে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে যেমন স্বৈরাচারী হতে পারে না, তেমনি প্রত্যেকের কাজও দক্ষতার সাথে সম্পন্নহয়। এর ফলে
দায়িত্বশীল সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়।

 জাতীয় প্রশাসন ও আঞ্চলিক প্রশাসনে ক্ষমতা বিভক্ত থাকে বলে নাগরিকরা এখানে প্রশাসনিক কাজে জড়িত হওয়ার
সুযোগ লাভ করে। ফলে নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং তাদের দায়িত্বও কর্তব্যবোধ বৃদ্ধি পায়। যুক্তরাষ্ট্রীয়
ব্যবস্থা নতুন নেতৃত্বগড়ে উঠতেও সাহায্য করে।

 যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বিপ্লব ও বিদ্রোহের সম্ভাবনা কম থাকে। কারণ অঞ্চলগুলোতে স্বায়ত্তশাসন থাকাতে তারা সন্তুষ্ট থাকে।
ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের ফলে জনগণও এতে অংশগ্রহণ করতে পারে। ফলে বিক্ষোভ দূর হয়।

 গণতন্ত্রপ্রয়োগের জন্য যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা একটি উত্তম আদর্শ। এখানে স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ফলে জনগণ
রাজনীতিতে অংশগ্রহণে উৎসাহী হয় এবং রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠে - যা গণতন্ত্রের সাফল্যের অন্যতম প্রধান শর্ত।

 যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় যে কোন সমস্যার খুব দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়। কারণ আঞ্চলিক সরকারগুলো প্রত্যেকে নিজেদের
সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারে। কেন্দ্রকে অঞ্চলগুলো নিয়ে ব্যস্তথাকতে হয় না বলে জাতীয় সমস্যার সমাধানে
এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে কাজ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের দোষ
যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থায় যেমন কিছু গুণ আছে সে সাথে কিছু দোষও আছে। নীচে দোষগুলো আলোচিত হলঃ

 যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এর অন্তর্নিহিত দুর্বলতা। যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার যে কোন সময়ে ভেঙে পড়তে
পারে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, বিভিন্নঅঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রথেকে বিচ্ছিন্নহওয়ার চেষ্টা চালায় এবং এর ফলে
যুক্তরাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

 যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা জটিল। কেন্দ্রও অঞ্চলগুলোতে পৃথক শাসন ব্যবস্থা চালু থাকার কারণে এ জটিলতা সৃষ্টি হয়। যা
সাধারণ নাগরিকদের সমস্যায় ফেলে দেয়।
 ক্ষমতা বন্টনের সুফল যেমন আছে - এর কুফলও তেমন আছে। ক্ষমতার বন্টন কেন্দ্রতথা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল
করে দিয়েছে।

 যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় আইন ও কর্মপদ্ধতির মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করা অত্যন্তকঠিন। কারণ পৃথক পৃথক অঙ্গরাজ্য পৃথক
পৃথক পরস্পর বিরোধী আইন তৈরী করতে পারে। কেন্দ্রের জন্য পরস্পর বিরোধী এ আইনের মধ্যে সমতা বিধান করা
অত্যন্তকষ্ট সাধ্য।

 যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা ব্যয়বহুল। একই ধরনের কাজ নিষ্পত্তি করার জন্য বহু কর্তৃপক্ষ থাকে। এতে একদিকে যেমন
শাসনব্যবস্থার দ্বিবিধ প্রভূত্বের বিস্তার ঘটে। তেমনি ব্যয়ও বেড়ে যায়।

 কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে অর্ন্তদ্বন্দ্ব থাকলে তা পররাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে এবং এতে করে দেশের ভাবমূর্তি
বিনষ্ট হতে পারে।

 যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রগতিশীলতার পরিপন্থী। কারণ সংবিধান দুষ্পরিবর্তনীয় হয় বলে যে কোন পরিবর্তনের সাথে সরকার
সহজে খাপ খাওয়াতে পারে না। এ ছাড়াও একই কারণে বিপ্লব ও বিদ্রোহের আশংকাও থাকে।

 যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল এ ধরনের ব্যবস্থা জরুরী অবস্থার মোকাবেলা করতে ব্যর্থ। দায়িত্ব
খন্ডিত ও সীমাবদ্ধ বলে সংকটকালীন সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণ সম্ভব হয় না। ফলে অনেক সময়ে সরকারকে সংকটে
পড়তে হয়।


সারকথা
যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বন্টন করা হয়। এ সরকার
ব্যবস্থার ক্ষমতার উৎস হল সংবিধান। এর ফলে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক সরকার নিজ নিজ এলাকায় স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে কাজ
করতে পারে। জনগণের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা একটি উৎকৃষ্ট আদর্শ। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় যেমন
কতকগুলো ভাল দিক আছে, সে সঙ্গে কিছু খারাপ দিকও রয়েছে। 
Share This

0 Response to "এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার কী বিস্তারিত আলোচনা কর"

Post a Comment

Popular posts